মো. নূর নবী শেখ
কেয়ামতের দিন হবে কঠিন ও ভয়াবহ। হাশরের ময়দানে দীর্ঘ অপেক্ষা, দুনিয়ার হিসাব-নিকাশ আর প্রচণ্ড উত্তাপে মানুষ যখন পিপাসায় কাতর হবে, তখন মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে থাকবে হাউজে কাউসার। এটি শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর জন্য আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ নেয়ামত। সেদিন তার উম্মতের সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা এই হাউজ থেকে পানি পান করার সুযোগ পাবেন। আর একবার সেই পানি পান করতে পারলে জীবনে আর কখনো পিপাসা লাগবে না।
পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসে হাউজে কাউসারের বিস্তর আলোচনা রয়েছে। এর সৌন্দর্য, পানির স্বাদ, বিস্তৃতি এবং সেখান থেকে পানি পান করার সৌভাগ্য— সবকিছুতেই রয়েছে পরকালের এক অপূর্ব নেয়ামতের বিস্তর বিবরণ।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে তার প্রিয় বন্ধু নবী মুহাম্মদ সা.-এর উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি।’ (সুরা কাউসার, আয়াত : ১)
আরবি ‘কাউসার’ শব্দের অর্থ অফুরন্ত কল্যাণ ও প্রাচুর্য। ইসলামি পরিভাষায় কাউসার বলতে জান্নাতের একটি বিশেষ নদীকে বোঝায়। অন্যদিকে, কেয়ামতের ময়দানে নবীজি (সা.)-এর উম্মতের জন্য যে বিশাল জলাধার থাকবে, সেটিকে বলা হয় হাউস বা হাউজে কাউসার।
মেরাজের রাত। যে রাতে নবী মুহাম্মদ সা. আল্লাহর সান্নিধ্যে সফর করেছিলেন। তখন জান্নাতে কাউসার নদী দেখেছিলেন নবীজি সা.। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি জান্নাতে বিচরণ করছিলাম। হঠাৎ একটি নদী দেখতে পেলাম, যার দুই তীরে ফাঁপা মুক্তার তৈরি অসংখ্য গম্বুজ ছিল। আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম, এটি কী? তিনি বললেন, এটি কাউসার, যা আপনার প্রতিপালক আপনাকে দান করেছেন। এর মাটি—অথবা এর সুবাস ছিল উৎকৃষ্ট কস্তুরির মতো।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫৮১)
আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জান্নাতের কাউসার নদী থেকে বিশেষ নালার মাধ্যমে কেয়ামতের ময়দানে অবস্থিত হাউসে পানি প্রবাহিত হবে। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি তার ফাতহুল বারি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, জান্নাতের নদীটির নাম কাউসার আর হাশরের ময়দানে উম্মতের জন্য নির্ধারিত জলাধারটির নাম হাউজ। জান্নাতের নদী থেকেই এই হাউজে পানি আসবে। (ফাতহুল বারি বি-শারহি সহিহিল বুখারি, ১১/৪৬৬)
হাউজে কাউসারের বিশালত্ব ও সৌন্দর্য সম্পর্কে হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এর পানি হবে অত্যন্ত পরিষ্কার, সাদা ও সুমিষ্ট। পানির সুবাস হবে কস্তুরির চেয়েও মনোরম। আর সেখানে থাকবে অসংখ্য পানপাত্র।
নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘আমার হাউজের বিস্তৃতি এক মাসের পথের দূরত্বের সমান। এর চার কোণ সমান। এর পানি রুপার চেয়েও শুভ্র এবং এর সুবাস কস্তুরির চেয়েও সুমিষ্ট। এর পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির মতো অসংখ্য। যে ব্যক্তি সেখান থেকে একবার পানি পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২২৯২)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, হাউজে কাউসারের পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫৪২)
পৃথিবীর পানি পান করলে কিছু সময়ের জন্য তৃষ্ণা মেটে। কিন্তু হাউজে কাউসারের পানি হবে ভিন্ন। সেখান থেকে একবার পানি পান করার পর আর কখনো পিপাসা অনুভব করতে হবে না। এটি হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য এক চিরস্থায়ী প্রশান্তির উপহার।
কেয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের পাশে উপস্থিত থাকবেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি তার উম্মতের অপেক্ষায় থাকবেন, যেন তারা এসে সেখান থেকে পানি পান করতে পারেন।
এ সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি হাউজের কিনারায় তোমাদের আগেই পৌঁছে অপেক্ষা করব। যে ব্যক্তি আমার কাছে আসবে, সে হাউজের পানি পান করবে। আর যে একবার তা পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫৮৩)
পৃথিবীতে যারা নবীজিকে দেখার সৌভাগ্য পাননি, তারাই ভালোবাসা ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে তার অনুসারী হয়ে জীবন কাটান। পরকালে সেই প্রিয় নবীজির সামনে উপস্থিত হওয়া এবং তার হাত থেকে পানি পান করার সুযোগ পাওয়া হবে তাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়। দীর্ঘ অপেক্ষা ও তৃষ্ণার পর এমন এক নেয়ামত পাওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করার সুসংবাদের পাশাপাশি হাদিসে রয়েছে কঠিন সতর্কবার্তাও। কেয়ামতের দিন কিছু মানুষ নবীজির কাছে আসার পরও হাউস থেকে পানি পান করতে পারবেন না। তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
নবীজি (সা.) এ বিষয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক আমার কাছে এগিয়ে আসবে। আমি যখন তাদের পানি পান করানোর জন্য হাত বাড়াব, তখনই আমার ও তাদের মাঝখান থেকে তাদের সরিয়ে নেওয়া হবে। আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক, এরা তো আমারই উম্মত! তখন বলা হবে, আপনি জানেন না, আপনার বিদায়ের পর তারা আপনার ধর্মের মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন করেছিল।’ (মুসলিম, হাদিস : ২২৯৩)
এই হাদিসে নবীজির পরবর্তী সময়ে দ্বীনের মধ্যে পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটানোর ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইমাম নববি তার ব্যাখ্যাগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যারা নবীজির সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, ধর্মের মধ্যে নতুন বিষয় সংযোজন করেছে কিংবা মুনাফিকিতে লিপ্ত হয়েছে, তাদের এভাবে হাউস থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে। (আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ, ৩/১৩৬-১৩৭)
তাই হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করার সৌভাগ্য পেতে হলে নবীজির আদর্শ ও সুন্নত অনুসরণ করে জীবন পরিচালনা করা জরুরি। পাশাপাশি দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হওয়া এবং বিভ্রান্তিকর পথ থেকে দূরে থাকতে হবে।
মহান আল্লাহ সুরা কাউসারে নবীজিকে কাউসার দানের কথা জানানোর পরই তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘অতএব, আপনি আপনার রবের উদ্দেশে নামাজ আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা কাউসার, আয়াত : ২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হয় ইবাদত ও ত্যাগের মাধ্যমে। পরকালে হাউজে কাউসারের পানি পান করার আশা শুধু মনে ধারণ করলেই যথেষ্ট নয়, বরং দুনিয়ার জীবনেও সেই অনুযায়ী আমল করতে হবে।
নিয়মিত নামাজ আদায়, আল্লাহর আনুগত্য, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ, সৎকাজ এবং নিজের চরিত্র সংশোধনের মাধ্যমে একজন মুমিন পরকালের সফলতার পথে এগিয়ে যেতে পারেন।
হাউজে কাউসার মহানবী (সা.)-এর জন্য আল্লাহর বিশেষ উপহার এবং তার উম্মতের জন্য এক অনন্য নেয়ামত। কেয়ামতের কঠিন দিনে সেই হাউজের পানি পান করার সৌভাগ্য অর্জনই হতে পারে একজন মুমিনের পরম প্রত্যাশা। তাই দুনিয়ার জীবন থেকেই নবীজির আদর্শে নিজেদের গড়ে তোলা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com