২৯ অক্টোবর ২০২৬
preview
ভয়-হুমকিতে মুক্তিযোদ্ধা পশারীর জানাজায় আসেনি কেউ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

​বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে গ্রামের কেউ অংশ নেননি—এমন দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে বাদী হওয়ার কারণে মানিক পশারীকে গ্রামের মানুষ ঘৃণা করে প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রচার করেন জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। এ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদও ফেসবুকে শেয়ার করেন তারা। 


তবে পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামে খোঁজ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে ভিন্ন বক্তব্য। তাদের দাবি, মানিক পশারীর প্রতি ঘৃণা নয়, বরং ভয়, আতঙ্ক ও হুমকির কারণেই অনেকে তার জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়ার সাহস পাননি। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথমে তার কবর খনন করেছিলেন এবং জানাজার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

কিন্তু সন্ধ্যার পর সেই কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কবর খননকারী ও জানাজায় অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ পরিবারের সদস্যদের। 

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে পুলিশি নিরাপত্তায় দাফন করতে হয় ৮৭ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধাকে। কবর পুনরায় খননে এগিয়ে আসেন তার পরিবারের নারীরা।

মুঠোফোনের আলোয় তাদের কবর খননের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। 

তবে কবর ভরাট ও হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক। তিনি বলেন, মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে জামায়াতের দলীয়ভাবে কোনো বাধা ছিল না। তার দাবি, যারা সাঈদীকে ভালোবাসেন, তারাই মাঠে নেমেছিলেন। তাদের সঙ্গে জামায়াতের কিছু নেতাকর্মীও ছিলেন বলে স্বীকার করেন তিনি।

গত শনিবারের (২৪ অক্টোবর) ওই ঘটনার পরও আতঙ্ক কাটেনি মানিক পশারীর স্বজনদের। গ্রামের অনেক বাসিন্দাই এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি। যারা কথা বলেছেন, তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে নিরাপত্তাহীনতা, মামলা-হামলার ভয় এবং প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে না পারার অভিজ্ঞতা।

চিতলিয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মোবারেক আলী হাওলাদার বলেন, মানিক পশারীর মৃত্যুর পর স্থানীয় বাসিন্দারাই তার কবর খনন করেছিলেন। জানাজার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তারা। তার মতে, গ্রামের মানুষ যদি মানিক পশারীকে ঘৃণাই করতেন, তাহলে তার কবর খনন করতে যেতেন না।

স্থানীয় বাসিন্দা মোবারেক আলী বলেন, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র পরিবারের সদস্য এবং পেশায় জেলে। কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়ার সাহস পাননি তারা। সন্ধ্যার পর কবর ভরাটের ঘটনার পর আতঙ্ক আরো বেড়ে যায়। রাতে পুলিশ দাফনের জন্য যাওয়ার পরও অনেকে কবরের কাছে যেতে সাহস করেননি।

মুছা হাওলাদার নামের আরেক বাসিন্দাও একই ধরনের কথা বলেন। তার দাবি, মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ স্থানীয়দের ছিল। কিন্তু খুঁড়ে রাখা কবরটি ভরাট করে দেওয়ার ঘটনার পর তারা আরো ভীত হয়ে পড়েন।

মানিক পশারীর প্রতিবেশী ও স্বজনেরা জানান, শনিবার দুপুরে মরদেহ নিয়ে পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে যান তারা। সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি ছিল। তবে বিষয়টি জানার পর জামায়াতের নেতাকর্মীরা আপত্তি জানান বলে অভিযোগ করেন তারা।

স্বজনদের দাবি, যারা মানিক পশারীর কবর খনন করেছিলেন এবং যারা জানাজায় অংশ নেবেন, তাদের মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে অনেকে ভয়ে কবরের কাছে যাননি। পরে বিকেলে পিরোজপুর পুলিশ লাইন্সে নিরাপত্তার মধ্যে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানিক পশারীর এক আত্মীয় জানান, অন্তত ১০ থেকে ১২টি মোটরসাইকেলে করে লোকজন সেখানে গিয়ে কবরটি ভরাট করেন। এ সময় মানিক পশারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেন তারা। তার দাবি, তাদের সবাই জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

কবরটি ভরাটের সময় প্রতিবাদ করেছিলেন জানিয়ে ওই আত্মীয় বলেন, ভয়ভীতি ও হুমকির কারণে পরে আর সেখানে যাওয়ার সাহস পাননি।

মানিক পশারীর ভগ্নিপতি চাঁন মিয়া পশারী বলেন, কবর ভরাটের সময় মানিক পশারীর মেয়ে শিমু কান্নাকাটি করছিলেন। এ সময় তাকেও গালমন্দ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

চাঁন মিয়ার ভাষ্য, চিতলিয়া গ্রামে পশারী বংশের প্রায় ৩০০ মানুষ রয়েছেন। ওই গ্রামে তাদের অনেক আত্মীয়স্বজনও আছেন। জানাজা ও দাফনের জন্য বাইরের লোকজনের প্রয়োজন ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনেরাই এ আয়োজন করতে পারতেন। কিন্তু ভয়ের পরিবেশে কেউ সামনে আসতে পারেননি।

কবর ভরাটের পর মানিক পশারীর দাফন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, রাত প্রায় ১১টার দিকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কবরটি পুনরায় প্রস্তুত করার কথা বলা হয়। কিন্তু ভয়ে কেউ এগিয়ে না আসায় পরিবারের নারীরাই কবর খননে হাত দেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন এক যুবক।

প্রশাসনের নির্দেশে কবরটি পুনরায় প্রস্তুত করা হলেও নতুন করে অন্য কোথাও কবর খনন করা হয়নি। আগের খোঁড়া কবরটিই পুনরায় প্রস্তুত করে সেখানে মানিক পশারীকে দাফন করা হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। কবর পুনরায় প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া ছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

মানিক পশারীর জানাজা তার নিজ বাড়িতে হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যেও এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে জানাজায় কেউ অংশ নেননি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ দাবির সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মুঠোফোনের আলোয় নারীদের কবর খননের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরপর জানাজা ও দাফনে স্থানীয়দের অনুপস্থিতির কারণ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ফেসবুক পোস্টে ঘৃণার কারণে মানিক পশারীকে প্রত্যাখ্যান করার দাবি সামনে আসে। 

অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনেরা বলছেন, তাদের অনুপস্থিতির কারণ ছিল ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা। চিতলিয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, তার দীর্ঘ জীবনে নারীদের কবর খনন করতে দেখেননি। এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেছে বলেও শোনেননি।

স্থানীয় বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান সিকদার জানান, একজন মুসলমানের জানাজা ও দাফনের আয়োজন স্থানীয়ভাবে করা সম্ভব না হওয়া এবং নারীদের কবর খননে বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতি তাদের গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু ভয়ের কারণে তারা কিছু করতে পারেননি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০০৯ সালের আগস্টে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন মানিক পশারী। সাঈদী পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা ছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মানিক পশারী আত্মগোপনে চলে যান। এ সময় তার বাড়িতে আগুন দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপর দীর্ঘদিন তিনি এলাকায় ফিরতে পারেননি।


ক্রেডিট : কালেরকণ্ঠ
​


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

ই-মেইল: kolom24news@gmail.com