মো. নূর নবী শেখ
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে গত কয়েক দিনে চীন ও ভারতীয় সেনারা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বাহিনীর মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর এ তথ্য জানিয়েছেন।
তার এই বক্তব্যের পর ভারত ও চীনের সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার বাহিনীর একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় শত্রুজিৎ কাপুর জানান, অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এই অবস্থায় সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডোদের প্রশংসা করেন তিনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে অরুণাচল প্রদেশের উচ্চ সুবনসিরি জেলার তাকসিং এলাকায় দুই দেশের টহল দলের মধ্যে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। ওই অঞ্চলে ভারতীয় বাহিনীর নিয়মিত টহল এবং চীনা সেনাদের উপস্থিতি ঘিরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এরপরও একাধিকবার মুখোমুখি অবস্থানের খবর পাওয়া যায়।
এর আগে অরুণাচল প্রদেশের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পিপলস পার্টি অব অরুণাচলের একটি অনুসন্ধানী দল অভিযোগ করেছিল, তাকসিং এলাকায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টহলস্থলে ভারতীয় বাহিনীর প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পশু চারণের জমিতে প্রবেশাধিকার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
তবে ভারতীয় সরকারি সূত্র আগে জানিয়েছিল, সীমান্তে দুই দেশের টহলদার দলের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা অনির্ধারিত সীমান্তের কারণে ঘটতে পারে এবং প্রচলিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তা সামাল দেওয়া হয়।
সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে ভারত
সীমান্তের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বাহিনী বিশেষ প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে। বাহিনীর মহাপরিচালক জানিয়েছেন, কমান্ডোরা সাম্প্রতিক মুখোমুখি অবস্থানের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সীমান্তবর্তী প্রতিটি ব্যাটালিয়নে এই বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া সীমান্তের বিভিন্ন ইউনিটে ড্রোন পরিচালনার দল গঠন করা হয়েছে। গালওয়ানের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদস্যদের প্রস্তুত করতে নতুন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধের প্রয়োজন বিবেচনায় সীমান্ত এলাকায় ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজও চলছে বলে জানিয়েছেন শত্রুজিৎ কাপুর।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের সংঘর্ষে ভারতের ২০ জন সেনা নিহত হন। ওই ঘটনার পর দুই দেশের সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও বেড়েছে।
অরুণাচল সীমান্তের উত্তেজনা কমাতে গত ৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় ভূখণ্ডের ওয়াচা এবং পরদিন চীনা ভূখণ্ডের দামাইয়ে সামরিক পর্যায়ের বৈঠক হয়।
পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে এই পর্যায়ের আলোচনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, আলোচনার পরও সীমান্তের সব এলাকায় উত্তেজনা দূর হয়নি।
সরকারের নীরবতা নিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন
এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের সমালোচনা করেছে বিরোধী দল কংগ্রেস। দলের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ অভিযোগ করেছেন, চীনের সঙ্গে সাম্প্রতিক মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি অরুণাচল প্রদেশে টহলস্থল নিয়ে উদ্বেগ, চীনের বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ এবং ব্রহ্মপুত্রের উজানে প্রস্তাবিত বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের বিষয়ও সামনে এনেছেন।
তার দাবি, এসব পদক্ষেপ ভারতের নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জলসম্পদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আগে জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সীমান্তে নজরদারি ও প্রতিরক্ষা জোরদার রয়েছে। সব মিলিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই অরুণাচল সীমান্তের পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থান কত দ্রুত কমে এবং সামরিক আলোচনার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায় কি না, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com