২১ অক্টোবর ২০২৬
preview
১০০ ডলার নিয়ে ঢাকা ছাড়া রনি আজ আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা জগতের প্রভাবশালী মুখ

মো. নূর নবী শেখ

১৯৮২ সালের কোনো দিনে মাত্র ১৩ বছরের এক কিশোর পকেটে ১০০ ডলারের একটা নোট আর হাতে একমুখী টিকিট নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন। কোনো এক পলো ম্যাচের ফাঁকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে নিজেকে এক সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের ভক্ত ও একনিষ্ঠ রিপাবলিকান দাবি করা সেই কিশোরই আজকের মাসুদুল রনি ওয়াহিদ; আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ও রাজনীতির অন্দরমহলে যাকে সবাই চেনেন (রন) নামে। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার চার দশক পর, কোনো দৃশ্যমান সামরিক বা প্রাতিষ্ঠানিক গোয়েন্দা পটভূমি ছাড়াই, তিনি গড়ে তুলেছেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা আরকানাম গ্লোবাল।

চলতি বছরের জুলাই মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কার্যালয়ে এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী সদস্য মাইকেল ম্যাককলের পাশাপাশি রনি ওয়াহিদকে ভূষিত করা হয়েছে ইউক্রেনের মর্যাদাপূর্ণ 'অর্ডার অব মেরিট' পদকে। তবে আন্তর্জাতিক খবরের শিরোনামে বার বার উঠে আসলেও নিজ দেশ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে তিনি এতদিন ছিলেন একেবারেই অজানা।

যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডের আদালতের নথি এবং একাধিক দেশের রেজিস্ট্রি রেজিস্টার বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো রনি ওয়াহিদের যে ব্যবসার রূপরেখা তুলে এনেছে, তা কোনো রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত তার সংস্থা আরকানাম গ্লোবাল মূলত সাবেক তুখোড় গোয়েন্দা প্রধানদের ভাড়া করে থাকে।

ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক প্রধান মীর দাগান, ফরাসি অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ডিসিআরআই-এর সাবেক প্রধান বের্নার্দ স্কুয়ারচিনি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ষোলোটি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ক ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অ্যাডমিরাল ডেনিস ব্লেয়ারের মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্বরা বিভিন্ন সময় এই সংস্থায় উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। গোপন নথিপত্র উদ্ধার, পাচারকৃত অর্থ চিহ্নিতকরণ এবং তথ্য সরবরাহের বিনিময়ে বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রপ্রধান ও আন্তর্জাতিক করপোরেট ক্লায়েন্টদের থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় করাই এদের প্রধান কাজ।

রনি ওয়াহিদের আরকানামের সবচেয়ে আলোচিত ক্লায়েন্ট ছিলেন কাজাখস্তানের প্রায় তিন দশকের একচ্ছত্র শাসক নূরসুলতান নাজারবায়েভ। কাজাখস্তানের পদচ্যুত ও নির্বাসিত বিরোধী দলীয় নেতা মুক্তার আব্লিয়াজভ এবং আলমাতির সাবেক মেয়র ভিক্টর ক্রাপুনভের গোপন সম্পদের খোঁজে আরকানামকে প্রতি মাসে ২ লাখ ২০ হাজার থেকে আড়াই লাখ ডলার রিটেইনার ফি দিয়ে নিয়োগ করা হয়েছিল।

হ্যাক হওয়া সরকারি ইমেইল ও সুইজারল্যান্ডের আদালতের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০১২ সালের শেষ পর্যন্ত কাজাখ সরকার আরকানামকে ৩.৭ মিলিয়ন ডলার বিল পরিশোধ করে। এমনকি সুইজারল্যান্ডের প্রসিকিউটররা অভিযোগ তুলেছিলেন যে, কাজাখ বিরোধীদের ওপর নজরদারি, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং স্পাইওয়্যার সংবলিত ইমেইল পাঠানোর পেছনে আরকানামের হাত ছিল। তবে এই সমস্ত অভিযোগকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছিলেন রনি ওয়াহিদ।

কাজাখ সরকারের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত সহযোগী ও এফবিআই-এর তথ্যদাতা ফেলিক্স সাকারের সঙ্গেও এক চুক্তিতে আবদ্ধ হন ওয়াহিদ। সাকারের প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসে ১ লাখ ডলার এবং উদ্ধারকৃত সম্পদের ১৬ শতাংশ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজাখস্তানের উদ্ধার অভিযানে যুক্ত করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে সাকার প্রায় ২.৭ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেন।

অন্যদিকে, কাজাখ রাজপরিবারের বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রক্ষায় যুক্ত লন্ডনের 'জুসান টেকনোলজিস'-এর পর্ষদে থাকাকালীন ওপেনডেমোক্রেসি ও একাধিক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে কৌশলগত হয়রানিমূলক মামলা করার অভিযোগও ওঠে তার প্রতিষ্ঠিত অপর প্রতিষ্ঠান আরজেআই ক্যাপিটালের বিরুদ্ধে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রনি ওয়াহিদের ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু ইউক্রেন যুদ্ধ ও পেন্টাগনের বড় অঙ্কের চুক্তির দিকে মোড় নিয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে আরকানাম কিনে নেয় মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসকে প্রশিক্ষণ দেওয়া ফ্লোরিডাভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেট্রিয়ট ডিফেন্স গ্রুপ। পরবর্তীতে পেন্টাগন ও ইউক্রেন যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সামরিক যোগাযোগ বাড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন রনি।

পোল্যান্ডের রজেসজো এবং কিয়েভে কার্যালয় খুলে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে ড্রোন প্রযুক্তি ও বিশেষ নিরাপত্তা সরঞ্জাম জোগানে ভূমিকা রাখছে তার প্রতিষ্ঠান। এমনকি ২০২৫ সালের শেষভাগে প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টে ইউক্রেন সংঘাত নিরসনে উত্তর আয়ারল্যান্ড ধাঁচের এক শান্তি প্রস্তাবের রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন তিনি, যেখানে ইউক্রেনের সেনাপ্রধানের সাথে তার সরাসরি বৈঠকের কথা উল্লেখ করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, পেন্টাগনের শত মিলিয়ন ডলারের খাতা এবং হোয়াইট হাউজের অন্দরে রনি ওয়াহিদের নাম ছড়ালেও বিস্ময়কর তথ্য হলো, ১৩ বছর বয়সে বাংলাদেশ ছাড়ার পর গত চার দশকে বাংলাদেশের কোনো সরকার, লবিং ফার্ম, আন্তর্জাতিক দাতব্য সাহায্য কিংবা প্রবাসী সম্মেলনে রনি ওয়াহিদের বিন্দুমাত্র উপস্থিতিও পাওয়া যায়নি।

সূত্র: ডেইলি ওয়াদা


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

ই-মেইল: kolom24news@gmail.com