মো. নূর নবী শেখ
একটি জনপদের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রশাসনের আন্তরিকতা, জনসাধারণের সহযোগিতা, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। একটি উপজেলাকে উন্নয়ন ও জনকল্যাণের পথে এগিয়ে নিতে প্রশাসন ও নাগরিকদের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা যাচাইবিহীন সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে উপজেলার সার্বিক উন্নয়ন, জনস্বার্থ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কীভাবে আরও গতিশীল করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত সবার প্রধান বিবেচনা।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধনবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরজাহান আক্তার সাথীকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা, মতামত প্রকাশ করা এবং সমালোচনা করার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। তবে সেই সমালোচনা হওয়া প্রয়োজন তথ্যনির্ভর, যুক্তিসংগত ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক। একইভাবে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও জনগণের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রচলিত আইন, বিধিবিধান ও প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনের সময় তাঁকে নানা ধরনের পরিস্থিতি, সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। জনস্বার্থে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত সবার পছন্দসই নাও হতে পারে। আবার প্রশাসনিক কোনো সিদ্ধান্তে ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াও দায়িত্বশীলতার অংশ। এ কারণে কোনো কর্মকর্তা কিংবা তাঁর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়টির বাস্তবতা, প্রেক্ষাপট ও তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে আলোচিত কণ্ঠের সাংবাদিক আতিকুর রহমান খোকন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, তাঁর বাবা একজন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ডিএলও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সুবাদে ছোটবেলা থেকেই সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মপরিবেশ, দায়িত্ব ও বাস্তব সীমাবদ্ধতা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তাঁর। এ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় এবং অনেক সময় তাঁদের সমালোচনারও সম্মুখীন হতে হয়। তাই কোনো বিষয়ে মন্তব্য করার আগে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ধনবাড়ী একটি সম্ভাবনাময় জনপদ। এ উপজেলার উন্নয়ন, জনসেবার মান বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে দক্ষ, সৎ ও কর্মঠ কর্মকর্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ধনবাড়ীকে সরকারি কর্মকর্তাদের শাস্তিমূলক বদলির স্থান হিসেবে উল্লেখ করার প্রবণতা দেখা গেছে বলে অনেকে মনে করেন। এমন ধারণা উপজেলার ভাবমূর্তির জন্য ইতিবাচক নয়। তবে এ ধরনের ধারণার যথার্থতা যাচাইয়ের পাশাপাশি ধনবাড়ীকে একটি কর্মবান্ধব, সম্ভাবনাময় ও উন্নয়নমুখী জনপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
কোনো এলাকার উন্নয়নে প্রশাসনের আন্তরিকতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সাংবাদিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যদি দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান এবং নাগরিকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে পারেন, তাহলে জনসেবামূলক কার্যক্রম আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ধনবাড়ীর সচেতন মহলের অনেকে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের প্রশংসা করছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মতে, জনদুর্ভোগ নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া, জুয়ার আসর বন্ধে উদ্যোগ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের তৎপরতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যক্রমকে তাঁরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
তবে কোনো কর্মকর্তা কিংবা প্রশাসনের কার্যক্রমের মূল্যায়ন হওয়া উচিত নির্দিষ্ট কাজের ফলাফল, জনস্বার্থে তার প্রভাব এবং প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে। ভালো উদ্যোগের প্রশংসা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোনো সিদ্ধান্তে অসংগতি থাকলে তা যথাযথভাবে তুলে ধরাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দায়িত্বশীল প্রশংসা কাজের উৎসাহ বাড়ায়, আর যুক্তিনির্ভর সমালোচনা ভুল সংশোধন ও সেবার মান উন্নয়নে সহায়তা করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বর্তমানে জনমত প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানে কোনো বিষয় দ্রুত আলোচনায় আসতে পারে, যা জনসচেতনতা তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে যাচাইবিহীন তথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা অসম্পূর্ণ ঘটনার ভিত্তিতে মন্তব্য অনেক সময় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য বা অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত জরুরি।
একই সঙ্গে প্রশাসনেরও উচিত জনগণের অভিযোগ ও মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। কোনো নাগরিক সেবাপ্রাপ্তিতে সমস্যার মুখোমুখি হলে তাঁর অভিযোগ শোনা, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়া এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা প্রশাসনিক দায়িত্বেরই অংশ। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং প্রশাসন ও নাগরিকদের মধ্যকার দূরত্ব কমবে।
ধনবাড়ী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়; এ জনপদ এখানকার সব মানুষের। উপজেলার উন্নয়ন, সুনাম ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ নাগরিক—সবার। পারস্পরিক দোষারোপ কিংবা বিভাজনের পরিবর্তে উন্নয়নমূলক উদ্যোগে সহযোগিতা এবং সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত প্রচেষ্টা বেশি কার্যকর হতে পারে।
আমরা এমন একটি ধনবাড়ী দেখতে চাই, যেখানে সরকারি সেবা পেতে মানুষ হয়রানির শিকার হবে না, প্রশাসনের প্রতিটি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকবে, জনস্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড প্রশ্রয় পাবে না এবং ভালো কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরে সংশোধনের পথ তৈরি করা হবে।
একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও জনবান্ধব ধনবাড়ী গড়ে তুলতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিকল্প নেই। প্রশাসনের ভালো উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে, আর ভুলত্রুটি সংশোধনের জন্য গড়ে তুলতে হবে যুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল আলোচনার পরিবেশ। ব্যক্তি নয়, প্রাধান্য পাক জনস্বার্থ; বিরোধ নয়, গুরুত্ব পাক উন্নয়ন।
আমাদের প্রত্যাশা—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধনবাড়ী হয়ে উঠুক আরও সুন্দর, সমৃদ্ধ ও জনকল্যাণমুখী একটি উপজেলা। গড়ে উঠুক এমন এক ইতিবাচক প্রশাসনিক পরিবেশ, যেখানে প্রশাসন ও জনগণ পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং উন্নয়নের সহযাত্রী।
মো: পলাশ ইসলাম
সংবাদকর্মী
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com